ধরুন,
ঢাকার ব্যস্ত একটি সড়কে দুপুরের দিকে একটি দুর্ঘটনা ঘটেছে। মুহূর্তের মধ্যে আশপাশে
মানুষ জড়ো হয়। কেউ পানি দেয়, কেউ ফোন করে, কেউ আবার রোগীকে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়ার
চেষ্টা করে। কিন্তু এই গুরুত্বপূর্ণ সময়ে প্রকৃত চিকিৎসা সহায়তা শুরু হয় না। অনেক
ক্ষেত্রে রোগী হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই তার অবস্থা আরও সংকটাপন্ন হয়ে পড়ে।
ঘটনাস্থল
থেকে হাসপাতালে পৌঁছানোর মধ্যবর্তী এই সময়টুকুই হলো প্রি-হসপিটাল পর্যায়। বাস্তবে
এই সময়টাই অনেক ক্ষেত্রে জীবন ও মৃত্যুর ব্যবধান তৈরি করে। অথচ বাংলাদেশের জরুরি স্বাস্থ্যব্যবস্থায়
এই অংশটি এখনো তুলনামূলকভাবে অবহেলিত ও অসংগঠিত।
প্রি-হসপিটাল
কেয়ার কী এবং কেন গুরুত্বপূর্ণ
প্রি-হসপিটাল
কেয়ার বলতে বোঝায়, কোনো রোগী বা আহত ব্যক্তি হাসপাতালে পৌঁছানোর আগ পর্যন্ত তাকে
যে জরুরি চিকিৎসা সহায়তা, প্রাথমিক মূল্যায়ন, জীবনরক্ষাকারী ব্যবস্থা এবং নিরাপদ
পরিবহন প্রদান করা হয়। জরুরি অবস্থায় চিকিৎসা কেবল হাসপাতালের বিছানায় শুরু হবে—এই
ধারণা যথেষ্ট নয়। বরং দুর্ঘটনা বা আকস্মিক অসুস্থতার পর চিকিৎসা সহায়তা শুরু হওয়া
উচিত ঘটনাস্থল থেকেই।
সময়মতো
সঠিক সহায়তা না পেলে রোগীর অবস্থা দ্রুত অবনতি হতে পারে। বিশেষ করে সড়ক দুর্ঘটনা,
হৃদ্রোগ, স্ট্রোক, শ্বাসকষ্ট, অজ্ঞান হয়ে যাওয়া কিংবা অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের মতো
পরিস্থিতিতে প্রথম কয়েক মিনিট অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দুর্ঘটনা বা জরুরি অবস্থার পর
প্রথম এক ঘণ্টাকে প্রায়ই “গোল্ডেন আওয়ার” বলা হয়। এই সময়ের মধ্যে সঠিক পদক্ষেপ
নেওয়া গেলে অনেক ক্ষেত্রেই মৃত্যুহার ও জটিলতা কমানো সম্ভব।
বাংলাদেশের
প্রেক্ষাপটে বড় সমস্যা হলো, প্রি-হসপিটাল কেয়ার এখনো প্রাতিষ্ঠানিকভাবে সুসংগঠিত
নয়। ফলে মানুষ হাসপাতালভিত্তিক চিকিৎসার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। কিন্তু
হাসপাতালে পৌঁছাতে পৌঁছাতেই অনেক রোগীর অবস্থা জটিল হয়ে যায়। সাধারণ মানুষের মধ্যেও
প্রাথমিক চিকিৎসা ও জরুরি প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে জ্ঞান সীমিত। দুর্ঘটনার পর কী করতে
হবে, অজ্ঞান রোগীকে কীভাবে সামলাতে হবে, শ্বাসকষ্ট হলে কী পদক্ষেপ নিতে হবে—এসব বিষয়ে
অনেকেই অনিশ্চিত থাকে। কখনো কখনো ভুলভাবে রোগী নাড়াচাড়া করা বা অনুপযুক্ত সহায়তা
দেওয়ার কারণে তার অবস্থা আরও খারাপ হয়ে যেতে পারে।
সম্ভাব্য
করণীয়
বাংলাদেশে
প্রি-হসপিটাল কেয়ারকে একটি নীতিগত অগ্রাধিকার হিসেবে দেখা জরুরি। এ ক্ষেত্রে প্রথম
পদক্ষেপ হতে পারে সাধারণ মানুষের মধ্যে বেসিক ফার্স্ট এইড ও জরুরি প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে
সচেতনতা বৃদ্ধি। স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, কর্মক্ষেত্র এবং স্থানীয় কমিউনিটি পর্যায়ে
ছোট পরিসরে প্রশিক্ষণ কর্মসূচি চালু করা যেতে পারে। এতে দুর্ঘটনা বা জরুরি অবস্থার
পর আশপাশের মানুষ প্রাথমিক সহায়তা দিতে সক্ষম হবে।
দ্বিতীয়ত,
অ্যাম্বুলেন্স সেবাকে কেবল পরিবহনব্যবস্থা হিসেবে না দেখে একটি চলমান জরুরি চিকিৎসা
ইউনিট হিসেবে গড়ে তোলা দরকার। শুধু দ্রুত রোগী বহন করাই যথেষ্ট নয়; বরং হাসপাতালে
পৌঁছানোর আগ পর্যন্ত রোগীর অবস্থা স্থিতিশীল রাখাই হওয়া উচিত অ্যাম্বুলেন্স সেবার
প্রধান লক্ষ্য। এজন্য প্রশিক্ষিত প্যারামেডিক, জরুরি চিকিৎসা সরঞ্জাম, অক্সিজেন, স্ট্রেচার,
প্রাথমিক জীবনরক্ষাকারী ব্যবস্থা এবং সমন্বিত জরুরি যোগাযোগ ব্যবস্থা প্রয়োজন।
তৃতীয়ত,
প্রযুক্তির কার্যকর ব্যবহার জরুরি। একটি কেন্দ্রীভূত জরুরি হটলাইন, রিয়েল-টাইম অ্যাম্বুলেন্স
ট্র্যাকিং, মোবাইল অ্যাপভিত্তিক সেবা এবং হাসপাতালের সঙ্গে আগাম যোগাযোগ ব্যবস্থা চালু
করা হলে সাড়া দেওয়ার সময় কমানো সম্ভব। তবে এসব উদ্যোগ কার্যকর করতে হলে সরকারি ও
বেসরকারি খাতের মধ্যে সমন্বিত পরিকল্পনা দরকার।
বাস্তবধর্মী
পদক্ষেপ
বাংলাদেশের
প্রি-হসপিটাল কেয়ারের ঘাটতি কমাতে কয়েকটি কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে।
১.
প্রশিক্ষিত জনবল তৈরি
এই
সংকট মোকাবিলার অন্যতম প্রধান উপায় হলো প্রশিক্ষিত জনবল তৈরি করা। অধিকাংশ ক্ষেত্রে
দেখা যায়, অ্যাম্বুলেন্সে থাকা কর্মীদের প্রাথমিক চিকিৎসা সম্পর্কে পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ
নেই। উন্নত দেশগুলোতে প্যারামেডিক, ইমার্জেন্সি মেডিক্যাল টেকনিশিয়ান বা EMT, এবং
অ্যাডভান্সড লাইফ সাপোর্ট বা ALS ব্যবস্থা কার্যকরভাবে কাজ করে। কিন্তু বাংলাদেশে এ
ধরনের পেশা ও সেবা এখনো পর্যাপ্তভাবে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়নি। ফলে রোগীকে হাসপাতালে
নেওয়া হলেও যাত্রাপথে তার অবস্থা আরও খারাপ হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে।
২.
জরুরি পরিবহন ব্যবস্থাকে অগ্রাধিকার দেওয়া
জরুরি
রোগী পরিবহনে সময় একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কিন্তু যানজট, অনিয়ন্ত্রিত ট্রাফিক
ব্যবস্থা এবং অ্যাম্বুলেন্সকে অগ্রাধিকার না দেওয়ার সংস্কৃতি রোগী পরিবহনে বড় বাধা
তৈরি করে। অনেক সময় অ্যাম্বুলেন্সের সাইরেন বাজলেও অন্যান্য যানবাহন রাস্তা ছেড়ে
দেয় না। এর ফলে “জরুরি সেবা” বাস্তবে তার কাঙ্ক্ষিত কার্যকারিতা হারায়। তাই অ্যাম্বুলেন্স
চলাচলের ক্ষেত্রে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনাকে আরও কঠোর ও সচেতনতামূলক করতে হবে।
৩.
প্রযুক্তিনির্ভর সমন্বিত ব্যবস্থা গড়ে তোলা
উন্নত
দেশগুলোতে জরুরি নম্বরে কল করার সঙ্গে সঙ্গে নিকটস্থ অ্যাম্বুলেন্স পাঠানো হয় এবং
সংশ্লিষ্ট হাসপাতালকে আগেই প্রস্তুত করা হয়। বাংলাদেশেও ৯৯৯ নম্বরকে আরও কার্যকর একটি
ইন্টিগ্রেটেড ডিসপ্যাচ সিস্টেমে রূপান্তর করা যেতে পারে। কল পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে নিকটবর্তী
অ্যাম্বুলেন্স, হাসপাতাল এবং জরুরি চিকিৎসা দলকে একযোগে সক্রিয় করার ব্যবস্থা থাকা
উচিত।
সব
অ্যাম্বুলেন্সে GPS ট্র্যাকিং ও ডিজিটাল রিপোর্টিং ব্যবস্থা চালু করলে রোগীর অবস্থার
তথ্য হাসপাতালে আগেই পাঠানো সম্ভব হবে। একই সঙ্গে টেলি-মেডিক্যাল সাপোর্ট যুক্ত করা
হলে মাঠপর্যায়ে থাকা কর্মীরাও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের নির্দেশনা পেতে পারে। সরকারি ও বেসরকারি
অ্যাম্বুলেন্স সেবাকে একটি একক প্ল্যাটফর্মে যুক্ত করা গেলে সাড়া দেওয়ার সময় আরও
কমানো সম্ভব।
উপসংহার
সবশেষে
বলা যায়, প্রি-হসপিটাল কেয়ার শুধু একটি স্বাস্থ্যসেবা নয়; এটি দুর্ঘটনাস্থল থেকে
হাসপাতালের বিছানা পর্যন্ত একটি জীবনরক্ষাকারী সেতুবন্ধন। এই সেতুটি যত শক্তিশালী হবে,
তত বেশি জীবন বাঁচানো সম্ভব হবে। বাংলাদেশে জরুরি স্বাস্থ্যসেবাকে কার্যকর করতে হলে
প্রি-হসপিটাল কেয়ারকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। এজন্য নীতিনির্ধারক, স্বাস্থ্যখাত,
আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এবং সাধারণ জনগণ—সবাইকে সমন্বিতভাবে এগিয়ে
আসতে হবে।

